চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইটভাটাগুলোতে প্রকাশ্যে কাঠ পোড়ানোর মহোৎসব চলছে। কয়লার পরিবর্তে বনের কাঠ ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন উজাড় হচ্ছে বনজ সম্পদ, অন্যদিকে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ ও কৃষিজমি।
সরেজমিনে দেখা গেছে,রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়াহেদখীল এলাকায় অবস্থিত ৭০৫–মেসার্স রুস্তম ব্রিকস নামের ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কয়লার বদলে নির্বিঘ্নে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ভাটার ভেতরে ও আশপাশে বিশাল আকারের কাঠের স্তুপ মজুদ করে রাখা হয়েছে। এসব কাঠ পোড়ানোর ফলে চুল্লি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।ইটভাটার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিন-রাত মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ মণ জ্বালানি কাঠ পোড়ানো হয়। এসব কাঠ রাউজান উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে সামাজিক বনায়ন, বন বিভাগের সৃজিত বাগানসহ নানা উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।স্থানীয় সূত্র জানায়, রাউজানের বিভিন্ন সড়ক দিয়ে নিয়মিত বনের কাঠ পাচার হলেও বন বিভাগের তৎপরতা অত্যন্ত সীমিত। প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কাঠ পোড়ানো ইটভাটাগুলো নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাঠ ব্যবসায়ী বলেন,কাঠ ব্যবসায়ী সমিতিকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে কার্ড নিয়ে আমরা ইটভাটায় কাঠ সরবরাহ করি। এছাড়া রাউজানের বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সড়কে আলাদা লাইন খরচও দিতে হয়।এ বিষয়ে রুস্তম ব্রিকসের মালিক একরাম হোসাইন সাব্বিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দিতে রাজি হননি। জানা গেছে, এই ইটভাটার পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেই।উল্লেখ্য, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩–এর ৬ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি কাঠ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন অনুযায়ী এ অপরাধে কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।পরিবেশবিদরা বলছেন, এভাবে নির্বিচারে কাঠ পোড়ানোর ফলে দেশের বনজ সম্পদ দ্রুত ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং ভয়াবহভাবে বাড়ছে বায়ু দূষণ। তারা অবিলম্বে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিন বলেন, রাউজানে মোট ৩২টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে, এর মধ্যে বর্তমানে ২৬টি চালু রয়েছে। কোনোটিরই পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। যেসব ইটভাটায় কাঠ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ইছামতি রেঞ্জের আওতাধীন রাউজান ঢালার মুখ স্টেশন অফিসার এস এম রেজাউল ইসলাম বলেন,আমরা মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করি।গত ৩ জানুয়ারি দুটি জ্বালানি কাঠবাহী গাড়ি আটক করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।তবে জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না।এ বিষয়ে রাউজান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংছিং মারমা বলেন,ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বনাঞ্চল বা সামাজিক বনায়নের কাঠ ব্যবহার করে কেউ ইট পোড়ালে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রধান সম্পাদক প্রদীপ শীল - ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মোহাম্মদ আলাউদ্দীন।